২০২৫ সালের পিএমআই

সম্প্রসারণের ধারায় থাকলেও অর্থনীতির গতি ছিল ধীর

দেশের অর্থনীতি ২০২৫ সালজুড়েই মন্থর গতির মধ্য দিয়ে গেছে।

দেশের অর্থনীতি ২০২৫ সালজুড়েই মন্থর গতির মধ্য দিয়ে গেছে। অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি-বিষয়ক সূচক পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্সের (পিএমআই) তথ্য বলছে, গত বছরের প্রতিটি মাস সম্প্রসারণের ধারায় থাকলেও অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি ছিল খুবই ধীর। বছরটিতে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভালো ছিল জানুয়ারিতে। এরপর ধীরে ধীরে এ অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে। মাঝে কিছু ওঠানামা করলেও বছরের শেষ দুই মাস ছিল প্রায় স্থির। নভেম্বরে যেখানে পিএমআই মান ছিল ৫৪, ডিসেম্বরে এসে তা বেড়েছে মাত্র দশমিক ২ পয়েন্ট।

সর্বশেষ গতকাল ডিসেম্বরের পিএমআই প্রকাশ করা হয়। ব্যবসায়ীদের শীর্ষস্থানীয় সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ (পিইবি) প্রতি মাসেই যৌথভাবে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দেশের অর্থনীতির প্রধান চারটি খাত কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতের ওপর জরিপ চালিয়ে তৈরি করা এ প্রতিবেদনের মান ১০০-এর মধ্যে নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে পিএমআই মান ৫০-এর নিচে হলে দেশের অর্থনীতি সংকোচন ও ৫০-এর বেশি হলে সম্প্রসারণের ধারায় রয়েছে বলে বোঝানো হয়।

ডিসেম্বরে পিএমআই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের উৎপাদন ও নির্মাণ খাতের ব্যবসা-বাণিজ্য নভেম্বরের তুলনায় আরো দুর্বল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। সম্প্রসারণের ধারায় থাকলেও এ মাসে উৎপাদন খাতের পিএমআই দশমিক ১ পয়েন্ট কমে ৫৮ দশমিক ২ পয়েন্ট দাঁড়িয়েছে। টানা ১৬ মাস ধরে সম্প্রসারণ ধারা বজায় রাখলেও খাতটির গতি ছিল খুবই ধীর। আর টানা তিন মাস সম্প্রসারণের ধারায় থাকার পর আবারো সংকোচন ধারায় ফিরেছে নির্মাণ খাত। নভেম্বরে এ খাতের পিএমআই ৫১ দশমিক ২ পয়েন্ট থাকলেও ডিসেম্বরে এসে তা ৪৯ দশমিক ৮ পয়েন্টে নেমে গেছে।

আগের মাসের তুলনায় ডিসেম্বরে সামান্য বেড়েছে কৃষি ও সেবা খাতের পিএমআই। কৃষি খাত টানা চতুর্থ মাস সম্প্রসারণের ধারায় থেকে নভেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বরে পিএমআই বেড়েছে ২ দশমিক ২ পয়েন্ট। তখন এ খাতের পিএমআই ছিল ৫৯ দশমিক ৬। আর ধীরগতির হলেও টানা ১৫ মাস সম্প্রসারণ ধারায় ছিল সেবা খাত। নভেম্বরের তুলনায় দশমিক ২ পয়েন্টে বেড়ে ডিসেম্বরে এ খাতের পিএমআই হয়েছে ৫১ দশমিক ৮ পয়েন্ট। সব মিলিয়ে ডিসেম্বরের পিএমআই দাঁড়িয়েছে ৫৪ দশমিক ২ পয়েন্টে; যা নভেম্বরে ছিল ৫৪।

শুধু ডিসেম্বর নয়, ২০২৫ সালে প্রতি মাসে প্রকাশিত পিএমআই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বছরজুড়ে পিএমআই সম্প্রসারণ ধারায় থাকলেও ওঠানামার মধ্য দিয়েই গেছে দেশের অর্থনীতি। এর মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের সবচেয়ে সুবিধাজনক পরিস্থিতি ছিল বছরের প্রথম মাস তথা জানুয়ারি। এ মাসে সার্বিক পিএমআই ছিল ৬৫ দশমিক ৭ পয়েন্ট। এরপরের মাসেই এ সূচক কমে ৬৪ দশমিক ৬ পয়েন্টে নেমে যায়। মার্চে আরো কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৬১ দশমিক ৭ পয়েন্টে। পিএমআই অনুযায়ী অর্থনীতির অবস্থা সবচেয়ে খারাপ হয় এপ্রিলে। এ মাসের পিএমআই দাঁড়ায় ৫২ দশমিক ৯ পয়েন্টে। মূলত রমজানের ঈদকে কেন্দ্র করে সরকারি ছুটিতে ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের কারণে ওই মাসে পিএমআই উল্লেখযোগ্য আকারে কমে যায়। এরপর মে মাসে আবার ৬ পয়েন্ট বেড়ে পিএমআই দাঁড়ায় ৫৮ দশমিক ৯ পয়েন্টে। জুনে ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থবির হয়ে পড়ায় পিএমআই দাঁড়ায় ৫৩ দশমিক ১ পয়েন্টে। এরপর প্রতিটি মাসেই ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে সূচকটি। জুলাইতে ৬১ দশমিক ৫, আগস্টে ৫৮ দশমিক ৩, সেপ্টেম্বরে ৫৯ দশমিক ১ ও অক্টোবরে ৬১ দশমিক ৮ পয়েন্টে পৌঁছায় পিএমআই।

ডিসেম্বরের পিএমআই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মৌসুমি চাহিদা হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্য অস্থিতিশীলতার কারণে ব্যবসায়িক মনোভাব মন্দ থাকলেও আগামী বছরের (চলতি বছর) শুরু থেকে ধীরে ধীরে উন্নতির আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অধিকাংশ ব্যবসায়ী। এ বিষয়ে পিইবি চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘শক্তিশালী কৃষি খাতের অবদানের ফলে অর্থনীতিতে সামান্য সম্প্রসারণ লক্ষ করা গেছে। উৎপাদন খাতে পরপর দ্বিতীয় মাসের মতো প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, অন্যদিকে নির্মাণ খাত পুনরায় সংকোচনের পর্যায়ে ফিরে গেছে। তবে ভবিষ্যৎ ব্যবসা সূচক অর্থনীতির সব প্রধান খাতেই সম্প্রসারণ অবস্থায় রয়েছে, যা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে টেকসই আশাবাদ ও ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।’

আরও